1. admin@theinventbd.com : admin :
শুক্রবার, ০৭ মে ২০২১, ১২:৫৬ পূর্বাহ্ন

অটিস্টিক বাচ্চাকে বড় করার সবচেয়ে কঠিন বাধা মানুষ

অনলাইন ডেস্ক |
  • প্রকাশকাল | মঙ্গলবার, ২৭ এপ্রিল, ২০২১
  • ২৭ বার পঠিত

আমার মেয়ে তূরের বয়স এখন দশ। দুই বছর বয়সে তার অটিজম ধরা পড়ে। দেশ থেকে কেউ ফোন করলে কথা প্রসঙ্গে অবধারিতভাবে তূরের কথা উঠত। ওদের জিজ্ঞাসা করত যে তূরকে কীভাবে ম্যানেজ করা হয়? ‘এটা’ কেমন কঠিন? এটা মানে একটা অটিস্টিক বাচ্চাকে বড় করা। আমি জানি তারা হয়তো ওভাবে ভেবে বা খুব খারাপ অর্থে বলছেন না। তারা ভাবছেন এমন একটা বাচ্চাকে বড় করা মনে হয় খুব কঠিন। আমিও অস্বীকার করি না পথটা কঠিন। কিন্তু এটা কি সমস্ত বাচ্চার জন্য একই না? বাচ্চা যেমনই হোক, তাদের বড় করা প্রচণ্ড কঠিন না কিন্তু আবার ঠিক সহজ ব্যাপারও তো না।

বাবা হিসেবে আমি শুরুতে এগুলো শুনলে একটু ভেবেচিন্তে উত্তর দিতাম, কিন্তু এখন আর দিই না। উত্তর না দেওয়ার প্রধান কারণ আমি বারবার নিজেকে কাঠগড়ায় দাঁড় করাতে চাই না। অবশ্য এখন কেউ তেমন জিজ্ঞাসাও করে না, তবে দ্বিতীয় একটা প্রশ্ন অনেকেই করে-অটিস্টিক বাচ্চাকে বড় করার সময় সবচেয়ে কঠিন লাগে কোন জিনিসটা? এই প্রশ্নটার উত্তরের জন্য আমাকে দ্বিতীয়বার ভাবতে হয় না। এই প্রশ্নের উত্তর হলো- অন্য মানুষরা। অটিজমকে তো আর চোখে দেখা যায় না, তাই তূরকে নিয়ে আমি যখন রাস্তায় হাঁটি তখন অপরিচিতরা স্বাভাবিকভাবেই তূরের বিশেষ প্রয়োজনগুলো বুঝতে পারেন না। তূর বেশিরভাগ সময় অটিজমের ট্যাগ লাগিয়ে ঘোরে না বলে এটি খুবই স্বাভাবিক। প্রবাসের জীবনে দেখেছি তূর যখন হুট করেই একটা অদ্ভুত কিছু করে ফেলে কিছু লোকাল আমেরিকানসহ বাংলাদেশিরা মাঝে মাঝে চোখ তুলে তাকায়। ওই দৃষ্টি খুব মারাত্মক। এক দৃষ্টিতেই তারা আমাকে কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়ে রায় দিয়ে ফেলে-আমি ভালো বাবা না।

মজার বিষয় হলো যারা পরিচিত তারাও অনেক সময় ব্যাপারটা বোঝেন না। আমি জানি তারা ইচ্ছাকৃতভাবে করেন না। অটিজমের ব্যাপারে যদি ধারণা না থাকে তাহলে দেখা হলে বোঝা কঠিন ঠিক কীভাবে তূরের সঙ্গে মেশা উচিত। এটাও আমার এখন খুবই স্বাভাবিক মনে হয়। তূরের অটিজমের আগে তো আসলে এত রিসোর্স থাকার পরও আমি নিজেও পরিচিত ছিলাম না এই শব্দটির সঙ্গে। তাই তূরের একসময় যদি মেল্টডাউন (অকারণে কান্নাকাটি করা) হয় কিংবা আর একজন কোথায় দাঁড়িয়ে আছে সেটা না দেখেই সে তার দিকে দৌড় শুরু করে অথবা দোকানের প্রতিটা পণ্য শুঁকে শুঁকে দেখে তখন ব্যাপারগুলো একটু অস্বস্তিকর হয়। আমি যেহেতু আমার মেয়ের বিষয়গুলো জানি তাই অস্বস্তিটুকু নিমেষেই কেটে যায়।

এগুলো অবশ্য সবই আমার মাথাব্যথার কারণ। তূর এ ব্যাপারগুলো বোঝে না। বেশিরভাগ সময়ে সে পরোয়াও করে না। কারণ তার আচরণের জন্য আশপাশের মানুষ তার দিকে সেভাবে তাকায় না। মানুষ তাকায় আমার দিকে। তূরকে নিয়ে আমি বেশি বেশি বাইরে যাই, তাই মাঝে মাঝে মনে হয় মানুষ আমাদের দেখলে দুটো জিনিস ভাবে। প্রথমটি হলো তূর একটা বিরক্তিকর বাচ্চা আর দ্বিতীয়টি হলো আমি একটা খারাপ বাবা। মনে হয় মানুষ ভাবে আমি খুব অলস তূরের ব্যাপারে এবং আমি আমার প্যারেন্টিং জব ঠিকমতো পালন করছি না। ঠিকমতো পালন করছি না বলেই তো আমার মেয়ে সামাজিক রীতিনীতি এখনো বুঝতে পারছে না, যদিও তার চেয়ে ৫-৬ বছরের ছোট বাচ্চাও এগুলো বোঝে।

সবচেয়ে কষ্টকর ব্যাপার ঘটে যখন আমি ওকে পার্কে নিয়ে যাই। যখন ওর সমবয়সী বাচ্চারা ছোটাছুটি করছে তখন সে হয়তো এমন কিছু করছে যেটা ওর অর্ধেক বয়সী বাচ্চারা করে। যখন অন্য বাচ্চারা সুইংয়ে চড়ছে তখন সে হয়তো মাটিতে বসে হাত ফ্ল্যাপিং করে স্টিমিং করছে (হাত নাড়িয়ে চিৎকার-চেঁচামেচি করা)। বাচ্চাগুলো তখন অবাক হয়ে তাকায়। ওরা বুঝতেই পারে না পার্কের ফ্লোরে এমনকি আছে যে ওভাবে হাত নাড়াতে হবে। পার্কে থাকা কিছু বাবা-মাও মাঝে মাঝে ওভাবেই তাকায়। আগে এগুলো আমার হজম করতে কষ্ট হতো, কিন্তু এখন হয় না।

যখন তূর ছোট ছিল তখন এগুলো এত বেশি চোখে পড়ত না কিন্তু এখন সে যতই বড় হচ্ছে, স্বাভাবিকভাবেই এগুলো বেশি করে চোখে পড়ে। আরও বেশি দৃশ্যমান হচ্ছে। আমি প্রস্তুতি নিয়ে রেখেছিলাম কারণ জানতাম এটাই ঘটবে। আমি জানতাম একটা সময় আমি কেবল হাত নাড়িয়ে এগুলো তাড়িয়ে দিতে পারব না। আমি জানতাম আমি চাইলেও তাকে সারাক্ষণ আমার সঙ্গে রাখতে পারব না। তাকে স্কুলে যেতে হবে, কিছু এক্সট্রা কারিকুলার অ্যাকটিভিটিসে যেতে হবে এবং যত দিন যাবে ততই তাকে রক্ষা করার জন্য আমার যে শিল্ড তৈরি করেছি সেটা অল্প অল্প করে হলেও দুর্বল হয়ে আসবে। আমি চেষ্টা করতে পারি কিন্তু কিছুটা অনিশ্চয়তা চলে আসবেই। এটা ঠেকানোর উপায় নেই।

তবে যেটা সবচেয়ে অসাধারণ বিষয় সেটা হলো আমি জানি তূর কাউকে এ পর্যন্ত একটা ফুলের টোকাও দেয়নি। কারও হাত থেকে কোনো খেলনা কেড়ে নেয়নি। কাউকে ধাক্কা দেয়নি। কেউ কাঁদলে সে নিজে অস্থির হয়ে যায়। লাফাতে পছন্দ করে। আরও কত ব্যাপার যেগুলো শুধু আমি জানি কিন্তু বাইরের একজন মানুষ এর খবর জানেন না এবং তাদের জানার কোনো উপায়ও নেই, কারণ তারা তো আর আমার বাচ্চার সঙ্গে থাকেনি।

বাবা হিসেবে তূরের উন্নতি আমি যত খেয়াল করেছি ততই আমার ভেতর সাহস ফিরে এসেছে। হুট করে বড় কোনো উন্নতি খেয়াল না করে বরং আচরণ ছোট ছোট উন্নতিকেই খেয়াল করার চেষ্টা করেছি। যেমন-কোনো একটা কাজে খুব সচেতনভাবে খেয়াল করতাম এর আগেরবারের চেয়ে এবার ঠিক কতটুকু ইমপ্রুভ হয়েছে। যদি পজিটিভ চেঞ্জ হতো তাহলে পরবর্তী ধাপে আর একটু যোগ করার চেষ্টা করতাম আর যদি না হতো তাহলে খুঁজে বের করার চেষ্টা করতাম কী কী কারণে এটা পজিটিভ হয়নি। এভাবে আস্তে আস্তে করেই এক দিন খেয়াল করেছি আমি অনেকটা সাহস ফিরে পাচ্ছি কারণ ওর প্রচণ্ড পরিশ্রমে করা ওই ছোট ছোট উৎকর্ষ বড় কিছু ঘটার ভরসা দিত। এটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ ছিল আমার কাছে।

একটা ছোট্ট উদাহরণ দিই তাহলে বুঝতে সুবিধা হবে হয়তো। তূরকে বাইরে নিয়ে গেলে আমি সাধারণভাবে একটা একটা টার্গেট ঠিক করতাম। যদি কোনো দোকানে যেতাম তাহলে এক-দুই সপ্তাহ টার্গেট থাকত সে শুধু বিভিন্ন কিছু শেলফ থেকে নামাবে এবং সেগুলো আবার ঠিক জায়গামতো শেলফে রাখবে। আর এক সপ্তাহ হয়তো ১০ মিনিট লাইনে দাঁড়িয়ে থাকবে। আর এক সপ্তাহ হয়তো শপিং কার্ট সোজা করে ঠেলবে ইত্যাদি, ইত্যাদি। এগুলো আপাতদৃষ্টিতে ছোট মনে হলেও একসঙ্গে যখন করা হয় তখন স্বাভাবিকভাবেই টের পেয়েছি যে এগুলো আমি মারা যাওয়ার পর তূরকে একা একা বেঁচে থাকার মৌলিক দক্ষতাগুলো শেখাবে। হয়তো এখন না, ৫ বছর পরেও না, হয়তো ১০ বছর পরে কিন্তু সে শিখবেই ইনশাআল্লাহ।

তূরকে সামলানো কি সময়ের সঙ্গে সঙ্গে আরও কঠিন হবে? কে জানে হতেও পারে আবার নাও হতে পারে। ভবিষ্যৎ আমরা কেইবা বলতে পারি। তবে এগুলো খুব বেশি গুরুত্বপূর্ণ নয়। এগুলো আমি নিয়ন্ত্রণ করতে পারি কিন্তু অন্য মানুষের কোনো আচরণ আমার নিয়ন্ত্রণে নেই এবং এটাই অটিজমের সবচেয়ে কঠিন ব্যাপার বলে মনে হয় আমার কাছে। কঠিন হতো না যদি আমরা একটা পৃথিবীতে বসবাস করতাম যেখানে তূর কোনো প্রশ্ন ছাড়াই সমাজের কাছে গ্রহণযোগ্য হতো। কেবল গ্রহণযোগ্যতার প্রশ্ন নয় বরং যদি সমাজ তাকে তার মতো করে মেনে নিত। যেখানে আমরা কম জাজমেন্টাল হতাম। আর একজনকে ভালোবাসতে পারতাম রিগার্ডলেস কী পার্থক্য আছে। এভাবে হলে অটিজমের সবচেয়ে কঠিন ব্যাপারগুলো ভিন্ন হতো।

কিন্তু আমরা আদর্শ পৃথিবীতে বসবাস করি না। আমাদের বাস্তবতা একেবারে ভিন্ন। এখানে অন্য মানুষ আছে, সমাজ আছে, সমাজের নিজস্ব রীতি আছে। স্বাভাবিকভাবেই সমাজের সবাই সব বিষয়ে অবগত থাকেন না। আমি যতই চেষ্টা করি না কেন তূরকে শুধুই আমার পাশে বসিয়ে রাখতে পারব না আজীবন। ধীরে ধীরে অনেক মানুষের ভিড়েই সে তার নিজের একটা পৃথিবী গড়বে। সে তার পৃথিবীটা তার নিজের মতো করে সাজাবে। ওর পৃথিবীতে আনন্দ, সরলতা, শুদ্ধতা, সহানুভূতি, ভালোবাসা এবং অদ্ভুত অদ্ভুত সব জিনিসের প্রতি আগ্রহ দিয়ে ভরা থাকবে। অন্তত আমি জানব যে এই পৃথিবীতে কিছুটা সমস্যা থাকলেও আমার মেয়েটা ওর নিজস্ব পৃথিবীতে অনেক ভালো আছে। ধীরে ধীরে হয়তো এই পৃথিবীর মানুষরাও এ ব্যাপারগুলো বুঝবে এবং আস্তে আস্তে অটিজমকে তার মতো করেই মেনে করবে। আমি নিশ্চিত যে এটা হবেই। আমরা, নিউরো-টিপিকল মানুষরা অন্তত এটা বুঝি যে, পৃথিবীতে অটিজমের দরকার নেই কিন্তু তূরের মতো মানুষ অনেক বেশি দরকার।

অটিজমের মূল আনন্দের ব্যাপারটা না লেখা ভুল হবে। বাইরের মানুষের ব্যাপারগুলো শুরুতে মেনে নিতে কষ্ট হয় কিন্তু একবার যখন মেনে নেওয়া যায় তখনই আসলে পিতৃত্ব নামক ব্যাপারটিতে আনন্দের সূচনা হয়। তখন সবকিছুই ভালো লাগে। তূরের ছোট উন্নতিগুলো দেখলে গর্বিত লাগে। চিৎকার করে সবাইকে জানাতে ইচ্ছা করে। আমি জানাই, নিজের ওয়ালে লিখি, অফিসের বিভিন্ন কার্যক্রমে সুযোগ পেলেই জানাই, ফোরামে লিখি, পরিচিত কিংবা অপরিচিত অনেককেই নিজে থেকে উদ্যোগী হয়ে অটিজমের ব্যাপারে জানাতে চেষ্টা করি। আমি জানাই কারণ অটিজমের এই একমুখী রাস্তার শেষে কী আছে সেটা কেউই নিশ্চিত করে বলতে পারে না। জানালেই মানুষ একটু একটু করে অটিজমের ব্যাপারে জানবে। ছোট ছোট করে জানাগুলোই এক দিন একসঙ্গে হয়ে সবাইকে বড় করে জানার সুযোগ করে দেবে।

এই লেখার উদ্দেশ্য সবাইকে অটিজমের কথা জানানো এবং সঙ্গে সঙ্গে মানুষের সচেতনতা সৃষ্টি করা। একজন বাবা হিসেবে আমার অনুভূতি, আমার যুদ্ধ কোথায় হয় এবং সর্বোপরি আমার মেয়ে, তূরকে সবার সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেওয়া। আর সব বাচ্চার মতো তূরও আমাকে একই রকম আনন্দ দেয়, আমাকে গর্বিত করে। অটিজমের এই একমুখী রাস্তায় শেষটা নিশ্চিতভাবে না জানলেও বাবা হিসেবে এটা আমি আশা করতেই পারি যে শেষটা অসম্ভব সুন্দর কিছুই হবে, যেখানে তূর আত্মনির্ভর হয়ে তার জীবনযাপন করবে।

[খুলনা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষক মোহাম্মদ আরিফুজ্জামান ২০১১ সাল থেকে বাস করছেন আমেরিকায়। বর্তমানে সাউদার্ন ক্যালিফোর্নিয়া এডিসন কোম্পানির জ্যেষ্ঠ প্রকৌশলী হিসেবে কর্মরত। ২ এপ্রিল বিশ্বজুড়ে পালিত হয় অটিজম সচেতনতা দিবস। সেই লক্ষ্যে মেয়ে তূরকে নিয়ে তার লেখায় উঠে এসেছে অটিস্টিক বাচ্চার বেড়ে ওঠার নানা ধাপ।]

সংবাদটি শেয়ার করুন :

এই বিভাগের আরও খবর
Copyright © The Invent
error: Content is protected !!