1. admin@theinventbd.com : admin :
বুধবার, ২৮ জুলাই ২০২১, ১০:২১ অপরাহ্ন
সর্বশেষ

বেঁচে থাকলে রওশন জামিলের বয়স হতো ৯০

অনলাইন ডেস্ক |
  • প্রকাশকাল | শনিবার, ৮ মে, ২০২১
  • ৬৩ বার পঠিত
প্রায় পঁয়ত্রিশ বছর ঢাকার চলচ্চিত্রের নানা ধরনের চরিত্রে ছিল তার নিয়মিত উপস্থিতি

ঢাকার নৃত্যশিল্পে অগ্রগণ্য মুখ ছিলেন রওশন জামিল। তবে তার পরিচিতি বেশি ছড়িয়েছিল নাটক ও চলচ্চিত্রের অভিনেত্রী হিসেবে। কিংবদন্তি এ শিল্পীর জন্মদিন আজ। বেঁচে থাকলে তার বয়স হতো ৯০ বছর।

রওশন জামিলের জন্ম ১৯৩১ সালের ৮ মে ঢাকার রোকনপুরে। তার বাবার নাম আব্দুল করিম ও মা হোসনে আরা বেগম।

মা হোসেন আরার অনিচ্ছা সত্ত্বেও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত হয়েছিলেন রওশন। অবশ্য সামগ্রিক পরিবারিক পরিবেশ ছিল তার অনুকূলে।

রওশন জামিল নিজের পরিবার সম্পর্কে বলেছেন, ‘আমার বাবা তিনটে বিয়ে করেছিলেন। আমরা তিন মায়ের ভাইবোন এক বাড়িতেই বড় হয়েছি। সে জন্য বাড়িটা আনন্দভুবনের মতো হয়ে গেছিল। এক এক ভাই এক এক রকম, এক একজন এক একটা পছন্দ করত। কেউ খেলাধুলা করছে, কেউ বাগান করছে, ব্যাডমিন্টন কোর্ট বানাচ্ছে, এমনকি আমাদের বোনদের জন্যও আলাদা কোর্ট তৈরি করেছিল। রাতে খেলা হচ্ছে, সেই মজার ব্যাপার। হৈ হুল্লোড় হতো, বাসায় অনেক রকম লোক আসত। আমার বড় যে ভাই বাগান করতেন তিনি একটু বেপরোয়া ছিলেন, তিনি বাগান করতেন, ভায়োলিনও শিখতেন। ছোট ভাই গিটার আর বড় ভাই সেতার শিখতেন। অন্য বোনকে গানের ব্যবস্থা করে দিয়েছিলেন।’

রওশন জামিলের প্রাথমিক শিক্ষা পুরান ঢাকার লক্ষ্মীবাজারের সেন্ট ফ্রান্সিস স্কুলে। মাধ্যমিক পাশ করেন কামরুন্নেছা স্কুল থেকে। এরপর পড়াশোনা করেছেন ইডেন কলেজে। ১৯৪৭ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে নাচ শেখা শুরু করেন তিনি।

শিল্পী গণেশ নাথ (পরে গওহর জামিল) এবং রবিশঙ্কর চ্যাটার্জির উদ্যোগে তখন ঢাকার ওয়ারিতে প্রতিষ্ঠিত হয় শিল্পকলা ভবন। এই প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমেই বাংলাদেশে প্রাতিষ্ঠানিক নৃত্যচর্চা শুরু হয়। ১৯৪৮ সালে ঢাকার রেসকোর্স ময়দানে মঞ্চস্থ হয় নৃত্যনাট্য ‘ইন্দ্রের সভা’। এই নৃত্যনাট্যের কেন্দ্রীয় চরিত্রে অভিনয় করেন রওশন জামিল। গণেশ নাথের কাছে নাচের তালিম নেওয়ার সময়ই দুজনের মধ্যে প্রেম। পরে তা বিয়েতে পরিণতি লাভ করে ১৯৫২ সালে।

বিয়ের পর দাম্পত্যের মতো নৃত্যেও যৌথ যাত্রা শুরু হয় দুজনের। মঞ্চে নৃত্য উপস্থাপনায় তখন থেকেই ব্যস্ত হয়ে ওঠেন রওশন জামিল। তখন দুজনই ধ্রুপদি নাচে আরও দক্ষতা অর্জনের কথা ভাবেন। চলে যান কলকাতায়। সেখানে নৃত্যগুরু পণ্ডিত মারুথাপ্পা পিল্লাই এবং পণ্ডিত রাম নারায়ণ মিশ্রের কাছে তালিম নেন। শেখেন ভরতনাট্যম এবং কথাকলি নৃত্য।

মঞ্চে একক ও যৌথ নৃত্যের পাশাপাশি তখন রওশন জামিলের ডাক আসে বেতার থেকে। আমজাদ হোসেনের লেখা ‘হিস্ট্রি’ নাটকে তিনি প্রথমবারের মতো বাচিক অভিনয় করেন, ১৯৬৪ সালে। ১৯৬৫ সালে বাংলাদেশে টেলিভিশনের যাত্রা শুরু। সে সময় তিনি আমজাদ হোসেনের ‘রক্ত দিয়ে লেখা’ নাটকে অভিনয় করেন। চলচ্চিত্রে প্রথম অভিনয় নজরুল ইসলাম পরিচালিত ‘আলী বাবা চল্লিশ চোর’-এ।

প্রায় পঁয়ত্রিশ বছর ঢাকার চলচ্চিত্রের নানা ধরনের চরিত্রে ছিল তার নিয়মিত উপস্থিতি। পুরো সময়টাতেই চলচ্চিত্রের কিছু চরিত্রের জন্য রওশন জামিলের কোনো বিকল্পের কথা ভাবতে পারতেন না নির্মাতারা।

অভিনয়ের কারণে নাচে ভাটা পড়লেও তিনি কিন্তু সেটি ছাড়েননি। ধরে রেখেছিলেন। ১৯৫৯ সালে নৃত্যশিল্পী গওহর জামিল ও তিনি মিলে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন নৃত্য প্রশিক্ষণ কেন্দ্র জাগো আর্ট সেন্টার। ১৯৮০ সালে ২১ সেপ্টেম্বর সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারান গওহর জামিল। স্বামীর মৃত্যুর পর সংগঠনের হাল ধরেছিলেন রওশন জামিল। অর্ধশতাব্দী ধরে এই প্রতিষ্ঠান থেকে তালিম নিয়েছে হাজার হাজার শিক্ষার্থী।

রওশন জামিল অভিনয় করেছেন প্রায় দুই শ’ বেতারনাটক, তিন শতাধিক টেলিভিশন নাটক, প্রায় তিন শ’ চলচ্চিত্র, তিনটি বিজ্ঞাপন চিত্র এবং একাধিক নৃত্যনাট্যে।

জাগো আর্ট সেন্টারের প্রযোজনা নৃত্যাঞ্জলি, আনারকলি, এক মুঠো ভাতের জন্য, সূর্য ও সূর্যমুখী, শাস্তি, উজ্জ্বল প্রভাত, সামান্য ক্ষতি, কাঞ্চন মালা এবং ইতিহাসের একটি পাতা নৃত্যনাট্যের কোরিওগ্রাফি, পোশাক পরিকল্পনা ও পরিবেশনায় তার কাজ ছিল নান্দনিক ও সুনিপুণ।

নৃত্যের বাইরে মঞ্চে তার উল্লেখযোগ্য কাজ বিশ্ববিখ্যাত রুশ লেখক ম্যাক্সিম গোর্কির উপন্যাস ‘মা’ নাট্যরূপে মূল ভূমিকায় অভিনয়। ১৯৬৮ সালে ম্যাক্সিম গোর্কির জন্মশতবার্ষিকী উপলক্ষে ‘মা’ নাট্যরূপ মঞ্চে নিয়ে আসেন মোজাম্মেল হোসেন মন্টু এবং সোলায়মান। ওই বছর দুইবার এবং ১৯৭৩ সালে রুশ কমিউনিস্ট নেতা ভ্লাদিমির ইলিচ লেনিনের জন্মদিনে এটি মঞ্চস্থ হয়। প্রতিবারই মায়ের চরিত্রে অভিনয়ে আগের অভিনয়কে ছাড়িয়ে গেছেন রওশন জামিল।

বাংলাদেশ টেলিভিশনের শুরুতে ‘রক্ত দিয়ে লেখা’ নাটকে অভিনয়ের মাধ্যমেই মূলত রওশন জামিলের অভিনয় জীবনের শুরু। বাংলাদেশ টেলিভিশনের ধারাবাহিক নাটক ‘ঢাকায় থাকি’ এবং ‘সকাল-সন্ধ্যা’ তাঁকে আরও জনপ্রিয় করে তোলে।

১৯৬৭ সালে নজরুল ইসলাম পরিচালিত আরব্য রূপকথা অবলম্বনে ‘আলিবাবা চল্লিশ চোর’ চলচ্চিত্রে অভিনয়ের মাধ্যমে ঢাকার চলচ্চিত্রে তার বিচরণ শুরু। ১৯৭০ সালে মুক্তি পাওয়া প্রখ্যাত চলচ্চিত্রকার জহির রায়হানের ‘জীবন থেকে নেয়া’ চলচ্চিত্রের দুঃশাসক বড় বোনের চরিত্র তাঁকে সাফল্যের শীর্ষে নিয়ে আসে। তা ছাড়া আমজাদ হোসেনের রচনা ও পরিচালনায় ‘নয়নমনি’, শেখ নিয়ামত আলী ও মসিহউদ্দিন শাকের পরিচালিত ‘সূর্য দীঘল বাড়ী’ (১৯৭৯) চলচ্চিত্রে তার অভিনয় সমালোচকদের প্রশংসা পায়।

তার অভিনীত আরও কিছু বিখ্যাত চলচ্চিত্র— গোরি, গীত কাঁহি সঙ্গীত কাঁহি, মনের মতো বউ, ওরা ১১ জন, আবার তোরা মানুষ হ, তিতাস একটি নদীর নাম, সুজন সখী, গোলাপী এখন ট্রেনে, দেবদাস, রামের সুমতি, বেদের মেয়ে জোছনা, শঙ্খনীল কারাগার, পোকামাকড়ের ঘরবসতি, চিত্রা নদীর পারে, শ্রাবণ মেঘের দিন ও ‘লালসালু।

নৃত্যকলায় অবদানের জন্য ১৯৯৫ সালে বাংলাদেশের সর্বোচ্চ সম্মান একুশে পদকে ভূষিত হন রওশন জামিল। অভিনয়ের জন্য জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার, টেনাশিনাস পদক, সিকোয়েন্স অ্যাওয়ার্ড, বাচসাস চলচ্চিত্র পুরস্কার, তারকালোক পুরস্কারসহ বহু স্বীকৃতি পেয়েছেন তিনি।

রওশন জামিল ২০০২ সালের ১৪ মে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে মৃত্যুবরণ করেন।

গুণীজন ডট অর্গ অবলম্বনে

সংবাদটি শেয়ার করুন :

এই বিভাগের আরও খবর
Copyright © The Invent
error: Content is protected !!